লাইভ
×
Logo

জাতীয়

সাইবার অপরাধ দমনে বিশেষ ইউনিট, ৪ হাজার ৫৯২ সদস্যের কাঠামো পুলিশের

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ৫:৫৬ এএম

সাইবার অপরাধ দমনে বিশেষ ইউনিট, ৪ হাজার ৫৯২ সদস্যের কাঠামো পুলিশের

সাইবার অপরাধ দমনে বিশেষ ইউনিট

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা

অনলাইন প্রতারণা, হ্যাকিং, ব্যক্তিগত তথ্য চুরি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়রানির ঘটনা মোকাবিলায় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। এ লক্ষ্যে গঠন করা হয়েছে বিশেষায়িত সাইবার পুলিশ ইউনিট। পাশাপাশি ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব, তদন্তকারীদের প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ শনাক্তের কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে।

অনলাইনে ঘরে বসে আয়, ইউটিউবে লাইক দিয়ে অর্থ উপার্জন কিংবা সহজ কাজের বিনিময়ে বড় অঙ্কের আয়ের প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণার ঘটনা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। এসব প্রতারণায় শিক্ষার্থী, গৃহিণী ও বেকার তরুণদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। প্রথমে অল্প অঙ্কের বোনাস দিয়ে বিশ্বাস অর্জনের পর বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগে প্ররোচিত করার অভিযোগও রয়েছে।

সাইবার অপরাধে মামলার পরিসংখ্যান

সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাইবার অপরাধসংক্রান্ত ৩২টি জিআর ও ১৫৯টি সিআরসহ মোট ১৯১টি মামলা হয়েছে। একই সময়ে এসব অভিযোগে ১০১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে রাজধানীর রমনা বিভাগে ৮৮টি মামলায় ১৬৩ জন, তেজগাঁও বিভাগে ৫৩টি মামলায় ৪৯ জন এবং মতিঝিল বিভাগে ৩৩টি মামলায় ৪৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

৪ হাজার ৫৯২ সদস্যের সাইবার পুলিশ ইউনিট

প্রতিবেদনে উল্লেখিত তথ্য অনুযায়ী, ১ অক্টোবর ঢাকায় স্বতন্ত্র সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠন করা হয়েছে। অনুমোদিত কাঠামোতে ইউনিটটির জন্য ৪ হাজার ৫৯২ জন পুলিশ সদস্য ও কর্মীর পদ রয়েছে। একজন অতিরিক্ত আইজিপির নেতৃত্বে ইউনিটটি পরিচালিত হওয়ার কথা।

এ ছাড়া বিভাগ, জেলা ও থানা পর্যায়ে সাইবার অপরাধ তদন্তের জন্য পৃথক কার্যক্রম বা ডেস্ক রাখার উদ্যোগ রয়েছে।

পুলিশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর অংশ হিসেবে ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব স্থাপন ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও গুরুত্ব পাচ্ছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামে ডিজিটাল ফরেনসিক ও সাইবার ল্যাব চালুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি সিটিটিসিতে ফরেনসিক ল্যাব চালুর অনুমোদনের তথ্যও রয়েছে।

ডিজিটাল প্রমাণ বিশ্লেষণে বিশেষ গুরুত্ব

পুলিশ সদরদপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা চ্যানেল আই অনলাইনকে জানান, সাইবার অপরাধ তদন্তে মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, হার্ডডিস্ক, মেমোরি কার্ড ও ক্লাউড স্টোরেজ থেকে ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হবে।

এ ছাড়া অনলাইন লেনদেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রম, আইপি ঠিকানা, ইমেইল, ভুয়া আইডি এবং সন্দেহজনক লিংকের উৎস শনাক্তে প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।

সাইবার প্রতারণা, হ্যাকিং, অনলাইন হয়রানি, অর্থপাচার, ভুয়া তথ্য প্রচার এবং ক্রিপ্টোকারেন্সিসংশ্লিষ্ট অপরাধ তদন্তে বিশেষায়িত দক্ষতা প্রয়োজন। এ কারণে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, সিস্টেম বিশ্লেষক, আর্থিক তথ্য বিশ্লেষক, নেটওয়ার্ক প্রশাসক, ম্যালওয়্যার বিশ্লেষক, ডার্ক ওয়েব বিশ্লেষক ও ক্রিপ্টো বিশ্লেষকসহ বিভিন্ন পেশার দক্ষ জনবল নিয়োগের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে।

তদন্ত দ্রুত করার পরিকল্পনা

ওই কর্মকর্তা জানান, ডিজিটাল প্রমাণ দ্রুত সংগ্রহ ও সংরক্ষণ, ফরেনসিক পরীক্ষার সময় কমানো এবং তদন্তকারীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার চেষ্টা চলছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে উন্নত প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ নেওয়ার উদ্যোগও রয়েছে।

সম্প্রতি পুলিশ স্টাফ কলেজে সাইবার অপরাধের মামলা তদন্ত বিষয়ে ১০ দিনের বিশেষ ‘ট্রেনিং অব ট্রেইনার্স’ (টিওটি) কোর্স পরিচালিত হয়েছে। এতে ৩৩২ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা পরবর্তী সময়ে মাঠপর্যায়ের তদন্তকারীদের প্রশিক্ষণ দেবেন বলে জানানো হয়েছে।

জনসচেতনতা ও ভুক্তভোগীদের সহায়তা জরুরি

সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেটর আরিফ মঈনুদ্দীন চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, সাইবার অপরাধের শাস্তি, অভিযোগ জানানোর পদ্ধতি এবং আইনি সহায়তা পাওয়ার উপায় সম্পর্কে সাধারণ মানুষের কাছে সহজ ভাষায় তথ্য পৌঁছে দিতে হবে। তাঁর মতে, ব্যক্তিগত সচেতনতা, সরকারি প্রচার এবং কার্যকর আইন প্রয়োগের সমন্বয়েই প্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণা মোকাবিলা সম্ভব।

তিনি আরও বলেন, সাইবার পুলিশ ইউনিটের কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে অভিযোগ গ্রহণ, প্রমাণ সংগ্রহ, তদন্ত ও গ্রেপ্তারের বিভিন্ন ধাপে সমন্বয় বাড়তে পারে। তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে প্রশিক্ষিত জনবল, আধুনিক ল্যাব, দ্রুত তথ্য বিনিময় এবং আইনি প্রক্রিয়ার সঙ্গে প্রযুক্তিগত তদন্তের সমন্বয়ের ওপর।

অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, লজ্জা বা ভয়ের কারণে অনেক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন না। ফলে সাইবার অপরাধের সব ঘটনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নথিতে আসে না। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্কুল-কলেজ, ব্যাংক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়ানোর পাশাপাশি নারী ও শিশুদের জন্য বিশেষায়িত সহায়তা ব্যবস্থাও প্রয়োজন।

ভবিষ্যতের অপরাধ মোকাবিলায় প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ভবিষ্যতে প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ আরও বিস্তৃত হতে পারে। এমনকি রোবোটিক্স ব্যবহার করেও অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এখন থেকেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।

তিনি বলেন, এ ধরনের অপরাধ তদন্তে প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি ডিজিটাল ফরেনসিক, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ভয়েস অ্যানালাইসিস, সাইবার ট্র্যাকিং ও ডেটা অ্যানালিটিকস বিষয়ে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। দক্ষ জনবল তৈরি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ভুক্তভোগীদের দ্রুত প্রতিকার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে সাইবার অপরাধ দমনে পুলিশের নতুন উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, প্রশিক্ষিত জনবল, দ্রুত তদন্ত, আইনি কার্যকারিতা এবং জনসচেতনতার সমন্বয়ের ওপর। নাগরিকদের সতর্কতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর পদক্ষেপ একসঙ্গে এগোলে অনলাইন পরিসরকে আরও নিরাপদ করা সম্ভব।

সূত্র: চ্যানেল আই অনলাইন; সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য।

মন্তব্য করুন

Logo

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।

চ্যানেল ৫ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত